Home / বিষয় / প্রশ্নোত্তরে রমযান ও ঈদ (১ম পর্ব)

প্রশ্নোত্তরে রমযান ও ঈদ (১ম পর্ব)

১ম অধ্যায়
সিয়াম : অর্থ ও হুকুম
প্রশ্ন ১ : সিয়ামের শাব্দিক অর্থ কি?
উত্তর : সিয়ামের শাব্দিক অর্থ বিরত থাকা। ফার্সী ভাষায় এটাকে রোযা বলা হয়।
প্রশ্ন ২ : রমযান মাসের সিয়ামের হুকুম কি?
উত্তর : এটা ফরয।
প্রশ্ন ৩ : এটা কোন হিজরী সালে ফরয হয়েছে?
উত্তর : দ্বিতীয় হিজরীতে।
প্রশ্ন ৪ : সিয়াম ফরয হওয়ার দলীল জানতে চাই।
উত্তর : 
(ক) আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٨٣ ﴾ [البقرة: ١٨٣]  
[১] ঈমানদারগণ!, তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মাতের উপর। যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। (বাকারাহ : ১৮৩)
﴿ شَهۡرُ رَمَضَانَ ٱلَّذِيٓ أُنزِلَ فِيهِ ٱلۡقُرۡءَانُ هُدٗى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَٰتٖ مِّنَ ٱلۡهُدَىٰ وَٱلۡفُرۡقَانِۚ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ ٱلشَّهۡرَ فَلۡيَصُمۡهُۖ …١٨٥ ﴾ [البقرة: ١٨٥]  
[২] রমযান হলো সেই মাস যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছিল। মানবজাতির জন্য হিদায়াত ও সুস্পষ্ট পথ নির্দেশক এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য নির্ণয়কারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যারাই এ মাস পাবে তারা যেন অবশ্যই সিয়াম পালন করে। (বাকারাহ : ১৮৫)
(খ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
بُنِيَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ وَإِقَامِ الصَّلاَةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ وَصَوْمِ رَمَضَانَ وَحَجِّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيْلاً
ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি : এ মর্মে সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া আর সত্যিকার কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল, সালাত কায়েম করা, যাকাত দেয়া, হজ করা এবং রমযান মাসের সিয়াম পালন করা। (বুখারী : ৮; মুসলিম : ১৬)
২য় অধ্যায়
فضل شهر رمضان
রমযান মাসের ফযীলত
প্রশ্ন ৫ : রমযান মাসের ফযীলত ও মর্যাদা সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : চন্দ্র মাসের এটা এক অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ মাস। এ মাসের ফযীলত অপরিসীম। নীচে ধারাবাহিকভাবে রমযান মাসের কিছু ফযীলত তুলে ধরা হল :
[১] ইসলামের পাঁচটি রুকনের একটি রুকন হল সিয়াম। আর এ সিয়াম পালন করা হয় এ মাসেই।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٨٣ ﴾ [البقرة: ١٨٣]  
অর্থাৎ হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। (বাকারাহ : ১৮৩)
[২] এ মাসের সিয়াম পালন জান্নাত লাভের একটি মাধ্যম।
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ آمَنَ بِاللهِ وَبِرَسُولِهِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وآتى الزَّكَاةَ وَصَامَ رَمَضَانَ كَانَ حَقًّا عَلَى اللهِ أَنْ يُدْخِلَهُ الْجَنَّةَ 
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনল, সালাত কায়েম করল, যাকাত আদায় করল, রমযান মাসে সিয়াম পালন করল তার জন্য আল্লাহর উপর সে বান্দার অধিকার হল তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেয়া। (বুখারী : ২৭৯০)
[৩] রমযান হল কুরআন নাযিলের মাস
﴿ شَهۡرُ رَمَضَانَ ٱلَّذِيٓ أُنزِلَ فِيهِ ٱلۡقُرۡءَانُ هُدٗى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَٰتٖ مِّنَ ٱلۡهُدَىٰ وَٱلۡفُرۡقَانِۚ …١٨٥ ﴾ [البقرة: ١٨٥]  
অর্থাৎ ‘‘রমাযান মাস- যার মধ্যে কুরআন নাযিল করা হয়েছে লোকেদের পথ প্রদর্শক এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট বর্ণনারূপে এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে।’’ (আল-বাকারা : ১৮৫) 
সিয়াম যেমন এ মাসে, কুরআনও নাযিল হয়েছে এ মাসেই। ইতিপূর্বেকার তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জীলসহ যাবতীয় সকল আসমানী কিতাব এ মাহে রমযানেই নাযিল হয়েছিল। (সহীহ আল জামে)
এ মাসেই জিবরীল আলাইহিস সালাম নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কুরআন শুনাতেন এবং তাঁর কাছ থেকে তিলাওয়াত শুন্তেন। আর রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনের শেষ রমযানে পূর্ণ কুরআন দু’বার খতম করেছেন। (মুসলিম)
[৪] রমযান মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়।
إِذَا جَاءَ رَمَضَانَ فُتِحَتْ أَبْوَابُ الْجَنَّةَ وَأُغْلِقَتْ أَبْوَابُ النَّارِ وَصُفِّدَتِ الشَّيَاطِيْنَ (وَفِيْ لَفْظٍ سُلْسِلَتِ الشَّيَاطِيْنَ)
‘‘যখন রমযান আসে তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় আর জাহা্ন্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানদের আবদ্ধ করা হয়।’’ (মুসলিম : ২৫৪৭)
আর এজন্যই এ মাসে মানুষ ধর্ম-কর্ম ও নেক আমলের দিকে অধিক তৎপর হয় এবং মসজিদের মুসল্লীদের ভীড় অধিকতর হয়।
[৫] এ রমযান মাসের লাইলাতুল কদরের এক রাতের ইবাদত অপরাপর এক হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও বেশি। অর্থাৎ ৮৩ বছর ৪ মাসের ইবাদতের চেয়েও বেশি সাওয়াব হয় এ মাসের ঐ এক রজনীর ইবাদতে।
(ক) আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ خَيۡرٞ مِّنۡ أَلۡفِ شَهۡرٖ ٣ تَنَزَّلُ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ وَٱلرُّوحُ فِيهَا بِإِذۡنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمۡرٖ ٤ سَلَٰمٌ هِيَ حَتَّىٰ مَطۡلَعِ ٱلۡفَجۡرِ ٥ ﴾ [القدر: ٣،  ٥]  
অর্থাৎ ‘‘কদরের এক রাতের ইবাদত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এ রাতে ফেরেশতা আর রূহ (জিরীল আঃ) তাদের রবের অনুমতিক্রমে প্রত্যেক কাজে দুনিয়ায় অবতীর্ণ হয়। (এ রাতে বিরাজ করে) শান্তি আর শান্তি- তা ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত থাকে।’’ (সূরা ক্বদর : ৪-৫)
(খ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
…..لله فِيْهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ مَنْ حَرُمَ خَيْرُهَا فَقَدْ حَرُمَ
‘‘এ মাসে এমন একটি রাত রয়েছে যা হাজার রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল সে মূলতঃ সকল কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হল।’’ (নাসায়ী : ২১০৬) 
[৬] এ পুরো মাস জুড়ে দু‘আ কবূল হয়
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
لِكُلِّ مُسْلِمٍ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ يَدْعُوْ بِهَا فِيْ رَمَضَانَ 
অর্থাৎ ‘‘এ রমযান মাসে প্রত্যেক মুসলমান আল্লাহর সমীপে যে দু‘আই করে থাকে-তা মঞ্জুর হয়ে যায়।’’ (আহমাদ : ২/২৫৪) 
[৭] এ মাসে মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়া হয়
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
إِنَّ لِلَّهِ عُتَقَاءَ فِي كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ، لِكُلِّ عَبْدٍ مِنْهُمْ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ
অর্থাৎ (মাহে রমাযানে) প্রতিরাত ও দিনের বেলায় বহু মানুষকে আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নাম থেকে মুক্তির ঘোষণা দিয়ে থাকেন এবং প্রতিটি রাত ও দিনের বেলায় প্রত্যেক মুসলিমের দু‘আ- মুনাজাত কবূল করা হয়ে থাকে। (মুসনাদ আহমদ : ৭৪৫০)
[৮] এ মাস জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের মাস
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
يُنَادِيْ مُنَادٍ كُلَّ لَيْلَةٍ : يَا بَاغِىَ الْخَيْرَ أَقْبِلْ وَيَا بَاغِيَ الشَّرِّ أَقْصِرْ وَلله عُتَقَاءُ مِنَ النَّارِ وَذَلِكَ فِيْ كُلِّ لَيْلَةٍ
‘‘(এ মাসের)  প্রত্যেক রাতে একজন ঘোষণাকারী এ বলে আহবান করতে থাকে যে, হে কল্যাণের অনুসন্ধানকারী তুমি আরো অগ্রসর হও! হে অসৎ কাজের পথিক, তোমরা অন্যায় পথ চলা বন্ধ কর। (তুমি কি জান?) এ মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ তা‘আলা কত লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিযে থাকেন। (তিরমিযী : ৬৮২)
[৯] এ মাস ক্ষমা লাভের মাস 
এ মাস ক্ষমা লাভের মাস। এ মাস পাওয়ার পরও যারা তাদের আমলনামাকে পাপ-পঙ্কিলতা মুক্ত করতে পারল না রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ধিক্কার দিয়ে বলেছেন :
رَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ دَخَلَ عَلَيْهِ رَمَضَانَ ثُمَّ انْسَلَخَ قَبْلَ أَن يَّغْفِرَلَهُ
‘‘ঐ ব্যক্তির নাক ধূলায় ধুসরিত হোক যার কাছে রমযান মাস এসে চলে গেল অথচ তার পাপগুলো ক্ষমা করিয়ে নিতে পারল না।’’ (তিরমিযী : ৩৫৪৫)
[১০] রমযান মাসে সৎ কর্মের প্রতিদান বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেয়া হয়
এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
مَنْ تَقَرَّبَ فِيْهِ بِخَصْلَةٍ مِنَ الْخَيْرِ كَانَ كَمَنْ أَدَّى فَرِيْضَةً فِيْمَا سِوَاهُ وَمَنْ أَدَّى فِيْهِ فَرِيْضَةٌ كَانَ كَمَنْ أَدَّى سَبْعِيْنَ فَرِيْضَةً فِيْمَا سِوَاهُ
‘যে ব্যক্তি রমযান মাসে কোন একটি নফল ইবাদত করল, সে যেন অন্য মাসের একটি ফরয আদায় করল। আর রমযানে যে ব্যক্তি একটি ফরয আদায় করল, সে যেন অন্য মাসের ৭০টি ফরয আদায় করল।’ (সহীহ ইবন খুযাইমা : ১৮৮৭, হাদীসটি দুর্বল) 
[১১] এ মাসে একটি উমরা করলে একটি হজ্জ আদায়ের সওয়াব হয় এবং তা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে হজ্জ আদায়ের মর্যাদা রাখে।
ক- হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
فَإِنَّ عُمْرَةً فِيْ رَمَضَانَ ةَقْضِيْ حَجَّةً مَعِيْ
‘‘রমযান মাসে উমরা করা আমার সাথে হজ্জ আদায় করার সমতুল্য’’। (বুখারী : ১৮৬৩)
হাদীসে আছে,
খ-একজন মেয়েলোক এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করল,
مَا يَعْدِلُ حَجَّةٌ مَعَكَ؟ فَقَالَ : عُمْرَةُ فِيْ رَمَضَانَ
‘‘কোন ইবাদতে আপনার সাথী হয়ে হজ্জ করার সমতুল্য সাওয়াব পাওয়া যায়? তিনি উত্তর দিলেন, ‘‘রমযান মাসে উমরা করা’’ (আবূ দাউদ : ১৮৯৯০)
৩য় অধ্যায়
فضل الصيام
সিয়াম পালনের ফযীলত
প্রশ্ন ৬ : সিয়াম পালনকারীকে আল্লাহ কী কী পুরস্কার দেবেন?
উত্তর : সিয়াম পালনকারীকে যেসব পুরস্কার ও প্রতিদান আল্লাহ তা‘আলা দেবেন তার অংশ বিশেষ এখানে উল্লেখ করা হল :
[১] আল্লাহ স্বয়ং নিজে সিয়ামের প্রতিদান দেবেন।
হাদীসে কুদসীতে আছে, আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
كُلُّ عَمَلِ بَنِىْ آَدَمَ لَهُ إِلاَّ الصِّيَامَ فَإِنَّهُ لِيْ وَأَنَا أَجْزِئ بِهِ
‘‘মানুষের প্রতিটি ভাল কাজ নিজের জন্য হয়ে থাকে, কিন্তু সিয়াম শুধুমাত্র আমার জন্য, অতএব আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব। (বুখারী : ১৯০৪)
[২] সিয়াম অতি উত্তম নেক আমল
আবূ হুরাইরাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র একটি হাদীসে তিনি বলেছিলেন :
يَا رَسُوْلَ اللهِ مُرْنِيْ بِعَمَلٍ، قَالَ عَلَيْكَ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لاَ عَدْلَ لَهُ
‘‘হে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাকে একটি অতি উত্তম নেক আমলের নির্দেশ দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি সিয়াম পালন কর। কেননা এর সমমর্যাদা সম্পন্ন কোন আমল নেই।’’ (নাসাঈ : ২২২২) 
অন্যান্য ইবাদত মানুষ দেখতে পায়। কিন্তু সিয়ামের মধ্যে তা নেই। লোক দেখানোর কোন আলামত সিয়াম পালনে থাকে না। শুধুই আল্লাহকে খুশী করার জন্য তা করা হয়। তাই এ ইবাদতের মধ্যে রয়েছে বিশুদ্ধ ইখলাস।
হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
يَدَعُ شَهْوَتَهُ وَطَعَامَهُ مِنْ أَجْلِيْ
‘‘সিয়াম পালনকারী শুধুমাত্র আমাকে খুশী করার জন্যই পানাহার ও যৌন উপভোগ পরিহার করে।’ (১৮৯৪) 
[৩] ক- জান্নাত লাভ সহজ হয়ে যাবে।
সহীহ ইবনু হিববান কিতাবে আছে আবূ উমামা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করলেন-
يَا رَسُوْلَ اللهِ دُلُّنِيْ عَلَى عَمَلٍ أَدْخُلُ بِهِ الْجَنَّةَ قَالَ عَلَيْكَ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لاَ مِثْلَ لَهُ
আবূ উমামা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন যার কারণে আমি জান্নাতে যেতে পারি। তিনি বললেন, তুমি সিয়াম পালন কর। কেননা এর সমমর্যাদাসম্পন্ন কোন ইবাদাত নেই। (নাসাঈ : ২২২১)
খ. সিয়াম পালনকারীকে বিনা হিসেবে প্রতিদান দেয়া হয়
অন্যান্য ইবাদতের প্রতিদান আল্লাহ তা‘আলা তার দয়ার বদৌলতে ১০ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেন। কিন্তু সিয়ামের প্রতিদান ও তার সাওয়াব এর চেয়েও বেহিসেবী সংখ্যা দিয়ে গুণ দিয়ে বাড়িয়ে দেয়া হবে। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন,
كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ يُضَاعَفُ الْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعِ مِائَةِ ضِعْفٍ قَالَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ (إِلاَّ الصَّوْمَ فَإِنَّهُ لِيْ وَأَنَا أَجْزِي بِهِ(
‘‘মানব সন্তানের প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান দশ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, কিন্তু সিয়ামের বিষয়টি ভিন্ন। কেননা সিয়াম শুধুমাত্র আমার জন্য, আমিই এর প্রতিদান দেব। (মুসলিম : ১১৫১)
অর্থাৎ কি পরিমাণ সংখ্যা দিয়ে গুণ করে এর প্রতিদান বাড়িয়ে দেয়া হবে এর কোন হিসাব নেই, শুধুমাত্র আল্লাহই জানেন সিয়ামের পুণ্যের ভান্ডার কত সুবিশাল হবে।
[৪] জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সিয়াম ঢাল স্বরূপ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
اَلصِّيَامُ جُنَّةٌ يَسْتَجِنُّ بِهَا الْعَبْدُ مِنَ النَّارِ
‘‘সিয়াম ঢাল স্বরূপ। এ দ্বারা বান্দা তার নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করতে পার।’’ (আহমাদ : ১৫২৯৯)
[৫] জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য সিয়াম একটি মজবুত দূর্গ
হাদীসে আছে,
اَلصِّيَامُ جُنَّةٌ وَحِصْنُ حَصِيْنٌ مِنَ النَّارِ
‘‘সিয়াম ঢালস্বরূপ এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচার এক মজবুত দূর্গ।’’ (আহমাদ : ৯২২৫)
[৬] আল্লাহর পথে সিয়াম পালনকারীকে আল্লাহ জাহান্নাম থেকে দূরে রাখেন।
এ বিষয়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
ا- مَا مِنْ عَبْدٍ يَصُوْمُ يَوْمًا فِيْ سَبِيْلِ اللهِ إِلاَّ بَاعَدَ اللهُ بِذَلِكَ وَجْهَهُ عَنِ النَّارِ سَبْعِيْنَ خَرِيْفًا
(ক) ‘‘যে কেউ আল্লাহর রাস্তায় (অর্থাৎ শুধুমাত্র আল্লাহকে খুশী করার জন্য) একদিন সিয়াম পালন করবে, তদ্বারা আল্লাহ তাকে জাহান্নামের অগ্নি থেকে সত্তর বছরের রাস্তা পরিমাণ দূরবর্তীস্থানে রাখবেন। (বুখারী : ২৮৪০; মুসলিম : ১১৫৩)
ب-مَنْ صَامَ يَوْمًا فِيْ سَبِيْلِ اللهِ بَاعَدَ اللهُ وَجْهَهُ عَنِ النَّارِ سَبْعِيْنَ خَرِيْفًا
(খ) ‘‘যে ব্যক্তি একদিন আল্লাহর পথে সিয়াম পালন করবে আল্লাহ তার কাছ থেকে জাহান্নামকে সত্তর বছরের রাস্তা দূরে সরিয়ে নেবেন। (মুসলিম : ১১৫৩)
ج-عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ يَا رَسُولَ اللهِ مُرْنِي بِأَمْرٍ يَنْفَعُنِي اللهُ بِهِ قَالَ عَلَيْكَ بِالصِّيَامِ فَإِنَّهُ لاَ مِثْلَ لَهُ
(গ) আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, ‘‘আমি আল্লাহর রাসূলকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন একটি কাজের নির্দেশ দিন যার দ্বারা আমি লাভবান হতে পারি। তিনি বললেন, তুমি সিয়াম পালন কর। কেননা এর সমকক্ষ (মর্যাদা সম্পন্ন) কোন ইবাদত নেই। (নাসাঈ : ২২২১)
[৭] ইফতারের সময় বহু লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন।
হাদীসে আছে :
إِنَّ للهِ تَعَالَى عِنْدَ كُلِّ فِطْرٍ عُتَقَاءُ مِنَ النَّارِ، وَذَلِكَ كُلّ لَيْلَةٍ
ইফতারের মূহূর্তে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন বহু লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। মুক্তির এ প্রক্রিয়াটি রমাযানের প্রতি রাতেই চলতে থাকে। (আহমাদ : ৫/২৫৬)
[৮] সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশ্কের চেয়েও উত্তম (সুগন্ধিতে পরিণত হয়)।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
وَالَّذِيْ نَفْسِ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَخُلُوْفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللهِ مِنْ رِيْحِ الْمِسْكِ.
যার হাতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র জীবন সে সত্তার শপথ করে বলছি, সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহ তা‘আলার কাছে মিশকের ঘ্রাণের চেয়েও প্রিয় হয়ে যায়। (বুখারী : ১৯০৪;   মুসলিম : ১১৫১)
[৯] সিয়াম পালনকারীর জন্য রয়েছে দু’টি বিশেষ আনন্দ মুহূর্ত।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ فَرْحَةٌ عِنْدَ فِطْرِهِ وَفَرْحَةٌ عِنْدَ لِقَاءِ رَبِّهِ
সিয়াম পালনকারীর জন্য দু’টো বিশেষ আনন্দ মুহূর্ত রয়েছে : একটি হল ইফতারের সময়, আর দ্বিতীয়টি হল তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময়। (বুখারী : ৭৪৯২; মুসলিম : ১১৫১)
[১০] সিয়াম কিয়ামাতের দিন সুপারিশ করবে
হাদীসে আছে,
اَلصِّيَامُ وَالْقُرْآنُ يَشْفَعَانِ لِلْعَبْدِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَقُولُ الصِّيَامُ أَيْ رَبِّ مَنَعْتُهُ الطَّعَامَ وَالشَّهَوَاتِ بِالنَّهَارِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ وَيَقُولُ الْقُرْآنُ مَنَعْتُهُ النَّوْمَ بِاللَّيْلِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ قَالَ فَيُشَفَّعَانِ 
সিয়াম ও কুরআন কিয়ামাতের দিন মানুষের জন্য এভাবে সুপারিশ করবে যে, সিয়াম বলবে হে আমার রব, আমি দিনের বেলায় তাকে (এ সিয়াম পালনকারীকে) পানাহার ও যৌনতা থেকে বিরত রেখেছি। তাই তার ব্যাপারে তুমি আমার সুপারিশ কবূল কর। 
অনুরূপভাবে কুরআন বলবে, হে আমার রব, আমাকে অধ্যয়নরত থাকায় রাতের ঘুম থেকে আমি তাকে বিরত রেখেছি। তাই তার ব্যাপারে তুমি আমার সুপারিশ কবূল কর। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর উভয়ের সুপারিশই কবূল করা হবে। (আহমাদ : ২/১৭৪) 
[১১] সিয়াম হল গুনাহের কাফফারা
(ক) আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿ … إِنَّ ٱلۡحَسَنَٰتِ يُذۡهِبۡنَ ٱلسَّيِّ‍َٔاتِۚ ١١٤ ﴾ [هود: ١١٤]  
নিশ্চয়ই নেক আমল পাপরাশি দূর করে দেয়। (সূরা হুদ : ১১৪)
(খ) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
فِتْنَةُ الرَّجُلِ فِي أَهْلِهِ وَمَالِهِ وَوَلَدِهِ وَجَارِهِ تُكَفِّرُهَا الصَّلَاةُ وَالصَّوْمُ وَالصَّدَقَةُ (بخارى ومسلم(
পরিবার পরিজন, ধন-সম্পদ ও প্রতিবেশিদের নিয়ে জীবন চলার পথে যেসব গুনাহ মানুষের হয়ে যায় সালাত, সিয়াম ও দান খয়রাত সেসব গুনাহ মুছে ফেলে দেয়। (বুখারী : ৫২৫; মুসলিম : ১৪৪)
[১২] সিয়াম পালনকারীর এক রমযান থেকে পরবর্তী রমাযানের মধ্যবর্তী সময়ে হয়ে যাওয়া ছগীরা গুনাহগুলোকে মাফ করে দেয়া হয়।
ক- আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿ إِن تَجۡتَنِبُواْ كَبَآئِرَ مَا تُنۡهَوۡنَ عَنۡهُ نُكَفِّرۡ عَنكُمۡ سَيِّ‍َٔاتِكُمۡ وَنُدۡخِلۡكُم مُّدۡخَلٗا كَرِيمٗا ٣١ ﴾ [النساء: ٣١]  
‘‘তোমরা যদি নিষিদ্ধ কবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাক তাহলে তোমাদের ছগীরা গুনাহগুলোকে মুছে দেব এবং (জান্নাতে) তোমাদেরকে সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাব। (সূরা নিসা : ৩১)
খ-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
اَلصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ وَالْجُمُعَةُ إِلَى الْجُمُعَةِ وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ مُكَفَّرَاتٌ لِمَا بَيْنَهُنَّ إِذَا اجْتَنِبَتِ الْكَبَائِرُ
পাঁচ ওয়াক্ত সালাত এর মধ্যবর্তী সময় ও এক জুমুআ থেকে অপর জুমুআ এবং এক রমযান থেকে অপর রমযান পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ের মধ্যে হয়ে যাওয়া ছগীরা গুনাহগুলোকে (উল্লেখিত ইবাদতের) কাফ্ফারাস্বরূপ মুছে দেয়া হয় সে যদি কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে। (মুসলিম : ২৩৩)
[১৩] সিয়াম পালনকারীর পূর্বেকার গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াব হাসিলের আশায় রমযানে সিয়াম পালন করবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (বুখারী  : ৩৮; মুসলিম : ৭৬৯)
[১৪] সিয়াম যৌনপ্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে রাখে
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنْ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ
হে যুবকেরা! তোমাদের মধ্যে যে সামর্থ রাখে সে যেন বিবাহ করে। কেননা বিবাহ দৃষ্টি ও লজ্জাস্থানের হেফাযতকারী। আর যে ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ রাখেনা সে যেন সিয়াম পালন করে। কারণ এটা তার জন্য নিবৃতকারী। (অর্থাৎ সিয়াম পালন যৌন প্রবৃত্তি নিবৃত করে রাখে) (বুখারী : ১৯০৫; মুসলিম : ১৪০০)
[১৫] সিয়াম পালনকারীরা রাইয়ান নামক মহিমান্বিত এক দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
إِنَّ فِي الْجَنَّةِ بَابًا يُقَالُ لَهُ الرَّيَّانُ يَدْخُلُ مِنْهُ الصَّائِمُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لاَ يَدْخُلُ مِنْهُ أَحَدٌ غَيْرُهُمْ يُقَالُ أَيْنَ الصَّائِمُونَ فَيَقُومُونَ لاَ يَدْخُلُ مِنْهُ أَحَدٌ غَيْرُهُمْ فَإِذَا دَخَلُوا أُغْلِقَ فَلَمْ يَدْخُلْ مِنْهُ أَحَدٌ 
জান্নাতে একটি দরজা রয়েছে। যার নাম রাইয়্যান। কিয়ামতের দিন শুধু সিয়ামপালনকারীরা ঐ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। তাদের ছাড়া অন্য কেউ সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। সেদিন ঘোষণা করা হবে, সিয়াম পালনকারীরা কোথায়? তখন তারা দাঁড়িয়ে যাবে ঐ দরজা দিয়ে প্রবেশ করার জন্য। তারা প্রবেশ করার পর ঐ দরজাটি বন্ধ করে দেয়া হবে। ফলে তারা ব্যতীত অন্য কেউ আর সেই দরজা দিয়ে জান্নাতে ঢুকতে পারবেনা। (বুখারী : ১৮৯৬; মুসলিম : ১১৫২)
প্রশ্ন ৭ : কী ধরনের শর্ত পূরণ সাপেক্ষে উপরে বর্ণিত অফুরন্ত ফযীলত ও সওয়াব হাসিল করা যাবে?
উত্তর : সিয়ামের বরকতময় সাওয়াব ও পুরস্কার হাসিলের জন্য নিম্নোক্ত শর্তাবলী পূরণ করা আবশ্যক
[১] শুধুমাত্র আল্লাহকে খুশী করার জন্য সিয়াম পালন করতে হবে। মনের মধ্যে লোক দেখানোর ইচ্ছা বা অপরকে শুনানোর কোন ক্ষুদ্র অনুভূতি থাকতে পারবে না।
[২] সিয়াম পালন, সাহরী, ইফতার ও তারাবীহসহ সকল ইবাদত রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্নাত তরীকামত পালন করতে হবে।
[৩] খাওয়া-দাওয়া ও যৌনাচার ত্যাগের মত মিথ্যা, প্রতারণা, সুদ, ঘুষ, অশ্লীলতা, ধোঁকাবাজি ও ঝগড়াবিবাদসহ সকল অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। চোখ, কান, জিহবা ও হাত পা সকল ইন্দ্রীয়কে অন্যায় কাজ থেকে হেফাযতে রাখতে হবে।
রাসূলু্ল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أ-مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ وَالْجَهْلَ فَلَيْسَ للهِ حَاجَةٌ أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ (بخارى)
ক) যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ এবং মুর্খতা পরিত্যাগ করতে পারলনা, তার রোযা রেখে শুধুমাত্র পানাহার বর্জনে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। (বুখারী : ১৯০৩)
ب-…فَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلاَ يَرْفَثْ يَوْمَئِذٍ وَلاَ يَصْخَبْ فَإِنْ سَابَّهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ فَلْيَقُلْ إِنِّي امْرُؤٌ صَائِمٌ
খ) তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সিয়াম পালন করবে সে যেন অশ্লীল আচরণ ও চেচামেচি করা থেকে বিরত থাকে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা তার দিকে মারমুখী হয়ে আসে তবে সে যেন তাকে বলে ‘আমি রোযাদার’। (অর্থাৎ রোযা অবস্থায় আমি গালিগালাজ ও মারামারি করতে পারি না। (মুসলিম : ১১৫১)
ج-رُبَّ صَائِمٍ حَظُّهُ مِنْ صِيَامِهِ الْجُوعُ وَالْعَطَشُ وَرُبَّ قَائِمٍ حَظُّهُ مِنْ قِيَامِهِ السَّهَرُ (رواه أحمد)
গ) এমন অনেক রোযাদার আছে যার রোযা থেকে প্রাপ্তি হচ্ছে শুধুমাত্র ক্ষুধা ও তৃষ্ণা। তেমনি কিছু নামাযী আছে যাদের নামায কোন নামাযই হচ্ছে না। শুধু যেন রাত জাগছে। (অর্থাৎ সালাত আদায় ও সিয়াম পালন সুন্নাত তরীকামত না হওয়ার কারণে এবং মিথ্যা প্রতারণা ও পাপাচার ত্যাগ না করায় তাদের রোযা ও নামায কোনটাই কবুল হচ্ছে না) (আহমাদ : ৮৮৪৩)
[৪] চতুর্থতঃ ঈমান ভঙ্গ হয়ে যায় বা ঈমান থেকে বহিস্কৃত হয়ে যায় এমন কোন পাপাচার থেকে বিরত থাকা
প্রশ্ন ৮ : কোন ধরনের পাপ করলে একজন মুসলিম ইসলাম থেকে বহিস্কৃত হয়ে যায়? একজন মুসলমান হয়ে যায় অমুসলমান- এ বিষয়ে জানতে চাই।
উ: অযু যেমন ছুটে যায়, নামায যেমন নষ্ট হয়, রোযাও যেমন ভঙ্গ হয়ে যায় তেমনি ইসলামও ছুটে যায়, ঈমানও ভঙ্গ হয় গুরুতর কিছু পাপের কারণে, ফলে ঐ পাপি ব্যক্তি মুসলমানের মিল্লাত থেকে বহিস্কৃত হয়ে যায়। অযূ, নামায, রোযা কী কারণে ভঙ্গ হয় তা আমরা জানি, কিন্তু ঈমান ভঙ্গ হয় এবং সেটা কী কারণে হয় তা আমরা অনেকেই জানি না। আর এটাই সবচেয়ে বড় বিপজ্জনক বিষয়। যে সব পাপের কারণে ইসলাম থেকে মানুষ বহিস্কৃত হয়ে যায় এবং তওবাহ না করলে কাফেরদের মতই চিরস্থায়ী জাহান্নামী হতে হবে সে বিষয়গুলো মাক্কা শরীফের দারুল হাদীসের শিক্ষক ও বহু গ্রন্থ প্রণেতা আল্লামা মুহাম্মদ বিন জামিল যাইনুর রচনাবলী থেকে এর সার সংক্ষেপ নিচে তুলে ধরা হলো :
 
ঈমান ভঙ্গকারী আমলসমূহ :
ঈমান ভঙ্গকারী কিছু পাপ কাজ আছে, যদি কোন মুসলিম এগুলোর কোন একটি পাপও করে ফেলে তবে সে শির্ক বা কুফুরী করে ফেলল। যার পরিণতিতে তার সমস্ত নেক আমল বরবাদ হয়ে যায়। এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে। তবে জীবদ্দশায় তাওবাহ করে ফিরে এলে আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করে দিতে পারেন।
নিচে এ জাতীয় পাপকাজের একটি তালিকা তুলে ধরা হলো :
[১] আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট দু‘আ করা। যেমন নবী বা মৃত আওলিয়াদের নিকট কিছু চাওয়া। অথবা কোন ওলি আওলিয়ার অনুপস্থিতিতে দূর থেকে তার কাছে সাহায্য চাওয়া। অথবা ঐ পীর বুজুর্গের উপস্থিতিতে তার কাছে এমন কিছু চাওয়া যা দেয়ার ক্ষমতা তার নেই। 
এ সম্বন্ধে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, 
﴿ وَلَا تَدۡعُ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَۖ فَإِن فَعَلۡتَ فَإِنَّكَ إِذٗا مِّنَ ٱلظَّٰلِمِينَ ١٠٦ ﴾ [يونس: ١٠٦]  
‘‘আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কাউকে ডেকো না, যে না করতে পারে তোমার কোন উপকার, আর না করতে পারে তোমার ক্ষতি। আর যদি তা করেই ফেল, তবে অবশ্যই তুমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।’’ (অর্থাৎ তুমি মুশরিক হয়ে যাবে।’’) (ইউনুস : ১০৬) 
এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 
(مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَدْعُو مِنْ دُوْنِ اللهِ نِدًّا دَخَلَ النَّارَ)
অর্থাৎ যে, ব্যক্তি এ অবস্থায় মারা যায় যে, সে আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে সমকক্ষ দাঁড় করিয়ে তার কাছে সাহায্য চায়, তাহলে সে জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করবে। (বুখারী : ৪২২)
[২] তাওহীদের কথা শুনে যাদের মনে বিতৃষ্ণা আসে এবং বিপদে আপদে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া থেকে দূরে থাকে। আর অন্তরে মুহাববতের সাথে ডাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এবং মৃত ওলি আওলিয়া ও জীবিত (অনুপস্থিত), পীর মাশায়েখদেরকে এবং সাহায্য চায় তাদেরই কাছে। এ বিষয়ে মুশরিকদের উদাহরণ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, 
﴿ وَإِذَا ذُكِرَ ٱللَّهُ وَحۡدَهُ ٱشۡمَأَزَّتۡ قُلُوبُ ٱلَّذِينَ لَا يُؤۡمِنُونَ بِٱلۡأٓخِرَةِۖ وَإِذَا ذُكِرَ ٱلَّذِينَ مِن دُونِهِۦٓ إِذَا هُمۡ يَسۡتَبۡشِرُونَ ٤٥ ﴾ [الزمر: ٤٥]  
‘‘যখন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন আখিরাতের উপর বেঈমান লোকদের অন্তর বিতৃষ্ণায় ভরে যায়। আর যখন আল্লাহ ছাড়া অন্য উপাস্য (পীর বুজুর্গের) নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন তাদের মনে আনন্দ লাগে। (যুমার : ৪৫)
[৩] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অথবা কোন ওলির নাম নিয়ে পশু যবাই করা। এটা নিষেধ করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَٱنۡحَرۡ ٢ ﴾ [الكوثر: ٢]  
‘‘সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর এবং তাঁরই জন্য যবেহ কর।’’ (কাওসার : ২)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : 
لَعَنَ اللهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللهِ
যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উদ্দেশ্যে যবাই কার্য করে আল্লাহ তা‘আলা প্রতি অভিশাপ বর্ষণ করেন। (মুসলিম : ১৯৭৮)
উল্লেখ্য যে, যবাইয়ের সময় কেউ যদি বলে, ‘‘খাজা বাবা জিন্দাবাদ’’ তাহলে এটা তার ঈমান ভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
[৪] কোন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মান্নত করা, যেমন কবরে মাযারে মান্নত করা (শিরনী দেয়া) অত্যন্ত গর্হিত কাজ ও ঈমান বিনষ্টকারী শির্ক ও কবীরা গুনাহ। কারণ, মান্নত একমাত্র আল্লাহর জন্যই হতে হবে। 
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ … رَبِّ إِنِّي نَذَرۡتُ لَكَ مَا فِي بَطۡنِي مُحَرَّرٗا …٣٥ ﴾ [ال عمران: ٣٥]  
‘‘হে পালনকর্তা! আমার গর্ভে যে সন্তান রয়েছে আমি তাকে তোমার উদ্দেশ্যে মান্নত করলাম।’’ (আলে-ইমরান : ৩৫)
[৫] নৈকট্য লাভ ও ইবাদতের নিয়তে কোন কবরের চতুষ্পার্শে প্রদক্ষিণ বা তাওয়াফ করা
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ ثُمَّ لۡيَقۡضُواْ تَفَثَهُمۡ وَلۡيُوفُواْ نُذُورَهُمۡ وَلۡيَطَّوَّفُواْ بِٱلۡبَيۡتِ ٱلۡعَتِيقِ ٢٩ ﴾ [الحج: ٢٩]  
‘‘অতঃপর তারা যেন তাদের দৈহিক অপরিচ্ছন্নতা দূর করে, তাদের মান্নত পূর্ণ করে, আর তারা যেন বেশি বেশি এ প্রাচীনতম (কাবা) ঘরের তাওয়াফ করে। (হাজ্জ : ২৯)
[৬] আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন 
﴿ … فَعَلَيۡهِ تَوَكَّلُوٓاْ إِن كُنتُم مُّسۡلِمِينَ ٨٤ ﴾ [يونس: ٨٤]  
‘‘একমাত্র আল্লাহর উপরই ভরসা কর যদি তোমরা মুসলিম হয়ে থাক।’’ (ইউনুস : ৮৪)
[৭] জেনে বুঝে কোন রাজা, বাদশা বা সম্মানিত কোন পীর বুজুর্গ জীবিত বা মৃত ব্যক্তিকে ইবাদতের নিয়তে রুকু বা সিজদা করা। কেননা রুকু বা সিজদা একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত ইবাদত।
[৮] ইসলামের রুকনসমূহ হতে কোন একটি রুকন বা ভিত্তিকে অস্বীকার করা। যথা : সালাত, সওম, হজ্জ ও যাকাত। অথবা ঈমানের ভিত্তিসমূহের কোন একটি ভিত্তিকে অস্বীকার করা। আর সেগুলো হলো আল্লাহ, তাঁর রাসূলগণ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাকদীরের ভালমন্দ আল্লাহর পক্ষ হতে এবং আখেরাতের প্রতি ঈমান আনা। এছাড়াও দীনের অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় কার্যসমূহ যা দীনের অন্তর্ভুক্ত বলে সর্বজন বিদিত। এসবগুলোর উপর ঈমান আনতেই হবে। এর কোন একটিকে অস্বীকার করলেও ঈমান বিনষ্ট হয়ে যায়।
[৯] ইসলামী জীবন বিধান বা এর অংশ বিশেষকে ঘৃণা করা। এর কোন কোন বিধান পুরাতন ও অকেজো হয়ে গেছে মনে করা। আলেমগণ একমত হয়েছে এমন কোন ইবাদতের ক্ষেত্রে বা বৈষয়িক লেনদেন কিংবা অর্থনৈতিক কর্মকান্ড অথবা চারিত্রিক বিষয়ে ইসলামের উপদেশাবলীকে ঘৃণার চোখে দেখা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ وَٱلَّذِينَ كَفَرُواْ فَتَعۡسٗا لَّهُمۡ وَأَضَلَّ أَعۡمَٰلَهُمۡ ٨ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمۡ كَرِهُواْ مَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأَحۡبَطَ أَعۡمَٰلَهُمۡ ٩ ﴾ [محمد: ٨،  ٩]  
‘‘আর যারা কুফুরী করেছে তাদের জন্য রয়েছে নিশ্চিত ধ্বংস। আর তাদের কর্মফল বরবাদ করে দেয়া হবে। ঐ কারণে যে, আল্লাহর নাযিল করা (কুরআন বা তার অংশ বিশেষকে) তারা অপছন্দের দৃষ্টিতে দেখে। ফলে আল্লাহ তাদের সকল নেক আমল বরবাদ করে দিবেন। (মুহাম্মাদ : ৯)
[১০] কুরআন কারীম বা সহীহ হাদীসের কোন বিষয় নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রূপ করা। কিংবা ইসলামের কোন হুকুম আহকাম নিয়ে তামাশা করা। 
এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ … قُلۡ أَبِٱللَّهِ وَءَايَٰتِهِۦ وَرَسُولِهِۦ كُنتُمۡ تَسۡتَهۡزِءُونَ ٦٥ لَا تَعۡتَذِرُواْ قَدۡ كَفَرۡتُم بَعۡدَ إِيمَٰنِكُمۡۚ … ٦٦ ﴾ [التوبة: ٦٥،  ٦٦]  
‘‘বল, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রূপ করেছিলে? (কাজেই আজ আমার সামনে) তোমরা কোন ওজর আপত্তি পেশ করার চেষ্টা করোনা। ঈমান আনার পরও (সে বিদ্রূপের কারণে) পুনরায় অবশ্যই তোমরা কুফুরী করেছ।’’ (তাওবাহ : ৬৫-৬৬)
[১১] জেনে শুনে ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআন কারীমের কিংবা বিশুদ্ধ হাদীসের কোন অংশ বা কথা অস্বীকার করলে ইসলাম থেকে একেবারেই বহিস্কার হয়ে যায়। যদিও তা কোন ক্ষুদ্র বিষয়ে হোক।
[১২] মহান রবকে গালি দেয়া, দ্বীন ইসলামকে অভিশাপ দেয়া, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গালি দেয়া বা তাঁর কোন অবস্থা নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রূপ করা, তার প্রদর্শিত জীবন বিধানের সমালোচনা করা। এ জাতীয় কর্মকান্ডের কোন একটি কাজ করলেও সে কাফির হয়ে যাবে।
[১৩] আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ অথবা তাঁর গুণাবলীর কোন একটিকেও অস্বীকার করা অথবা কুরআন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত আল্লাহর কোন কার্যাবলী অস্বীকার করা বা এগুলোর অপব্যাখ্যা করা। 
[১৪] রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস না করা, বা সবাইকে বিশ্বাস করলেও কোন একজন নবীকে অবিশ্বাস করা। অথবা নবী রাসূলদের কাউকে তুচ্ছ ধারণা করা বা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখা।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ … لَا نُفَرِّقُ بَيۡنَ أَحَدٖ مِّن رُّسُلِهِۦۚ …  ٢٨٥ ﴾ [البقرة: ٢٨٥]  
‘‘আমরা তাঁর রাসূলগণের মধ্যে কারো ব্যাপারে তারতম্য করি না।’’ (বাকারা : ২৮৫) 
[১৫] আল্লাহ প্রদত্ত বিধান বাদ দিয়ে (মানব রচিত আইন দিয়ে) বিচার ফায়সালা করা- এ ধারণা করে যে, এ যুগে ইসলামের আইন কানুন আর চলবে না। কারণ এ আইন অনেক পুরাতন। অথবা আল্লাহ প্রদত্ত আইনের বিপরীতে মানব রচিত আইনকে জায়েয মনে করা এবং আল্লাহর আইনের উপর মানুষের তৈরী আইনকে প্রাধান্য দেয়া। ঈমান ভঙ্গের কারণ হিসেবে এটি একটি ধ্বংসাত্মক আকীদা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ … وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡكَٰفِرُونَ ٤٤ ﴾ [المائ‍دة: ٤٤]  
‘‘আর যারা আল্লাহর অবতীর্ণ বিধান অনুযায়ী শাসন কার্য পরিচালনা করে না, তারা কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।’’ (আল-মায়িদা : ৪৪)
[১৬] ইসলামী বিচারে সন্তুষ্ট না হওয়া। ইসলামী বিচারে অন্তরে সংকোচ বোধ করা ও কষ্ট পাওয়া। বরং ইসলাম বহির্ভুত আইনের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে স্বস্তি বোধ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ حَرَجٗا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمٗا ٦٥ ﴾ [النساء: ٦٥]  
‘‘কিন্তু না, (হে মুহাম্মদ!) তোমার রবের শপথ। তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসম্ববাদের মীমাংসার ভার তোমার উপর ন্যস্ত না করে, অতঃপর তোমার ফায়সালার ব্যাপারে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে, আর তারা সর্বান্তকরণে তার সামনে নিজেদেরকে পূর্ণরূপে সমর্পণ করে।’’ (নিসা : ৬৫)
[১৭] আল্লাহর আইনের সাথে সাংঘর্ষিক এমন ধরনের আইন প্রণয়নের জন্য কোন মানুষকে ক্ষমতা প্রদান করা বা তা সমর্থন করা। অথবা ইসলামী আইনের সাথে সাংঘর্ষিক এমন ধরনের কোন আইনকে সঠিক বলে মেনে নেয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ أَمۡ لَهُمۡ شُرَكَٰٓؤُاْ شَرَعُواْ لَهُم مِّنَ ٱلدِّينِ مَا لَمۡ يَأۡذَنۢ بِهِ ٱللَّهُۚ … ٢١ ﴾ [الشورا: ٢١]  
‘‘তাদের কি এমন অংশীদার আছে যারা তাদের জন্য এমন কোন জীবন বিধান প্রণয়ন (ও আইন কানুন তৈরী) করে নিয়েছে যার অনুমতি আল্লাহ তাদেরকে দেননি। (শূরা : ২১)
[১৮] আল্লাহ কর্তৃক বৈধকৃত কাজকে অবৈধ করে নেয়া এবং অবৈধ কাজকে বৈধ করে ফেলা। যেমন সুদকে বৈধ বা হালাল কাজ বলা কিংবা হালাল মনে করা ইত্যাদি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿… وَأَحَلَّ ٱللَّهُ ٱلۡبَيۡعَ وَحَرَّمَ ٱلرِّبَوٰاْۚ … ﴾ [البقرة: ٢٧٥]  
‘‘আর আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ করেছেন আর সুদকে করেছেন হারাম।’’ (আল-বাকারা : ১৭৫) 
[১৯] আকীদা ধ্বংসাত্মক মতবাদের উপর ঈমান আনা। যেমন নাস্তিক্যবাদ, মাসুনিয়া, মার্কসবাদ, সমাজতন্ত্র, ধর্মমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা বা ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ, বা এমন জাতীয়তাবাদ যা আরবের অমুসলিমদেরকে অনাবর (আজমী) মুসলিমদের উপর প্রাধান্য দেয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ وَمَن يَبۡتَغِ غَيۡرَ ٱلۡإِسۡلَٰمِ دِينٗا فَلَن يُقۡبَلَ مِنۡهُ وَهُوَ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ ٨٥ ﴾ [ال عمران: ٨٥]  
‘‘আর যে কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কিছুকে দীন হিসেবে (অর্থাৎ জীবন বিধান হিসেবে) গ্রহণ করতে চাইবে, (আল্লাহর সমীপে) কক্ষনো তা কবূল করা হবে না। বরং সে ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। (আলে ইমরান : ৮৫)
[২০] দ্বীনের বিধি বিধান পরিবর্তন করা, এবং ইসলাম ছেড়ে অন্য কোন ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করা অর্থাৎ মুরতাদ হয়ে যাওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَمَن يَرۡتَدِدۡ مِنكُمۡ عَن دِينِهِۦ فَيَمُتۡ وَهُوَ كَافِرٞ فَأُوْلَٰٓئِكَ حَبِطَتۡ أَعۡمَٰلُهُمۡ فِي ٱلدُّنۡيَا وَٱلۡأٓخِرَةِۖ وَأُوْلَٰٓئِكَ أَصۡحَٰبُ ٱلنَّارِۖ هُمۡ فِيهَا خَٰلِدُونَ ٢١٧ ﴾ [البقرة: ٢١٧]  
‘‘আর তোমাদের যে কেউ নিজের দ্বীন (ইসলাম) থেকে (অন্য ধর্মে) ফিরে যায়, অতঃপর সে ব্যক্তি কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে তবে ঐ ধরনের লোকের (সমস্ত নেক) আমল, ইহকাল ও পরকাল উভয়জাহানেই বাতিল হয়ে যাবে। ফলে তারা হয়ে যাবে আগুনের বাসিন্দা। সেখানে (জাহান্নামে) তারা স্থায়ী হবে চিরকাল। (বাকারা : ২১৭)
[২১] মুসলমানদের বিরুদ্ধে অমুসলিমদেরকে সাহায্য সহযোগিতা করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ لَّا يَتَّخِذِ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ ٱلۡكَٰفِرِينَ أَوۡلِيَآءَ مِن دُونِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَۖ وَمَن يَفۡعَلۡ ذَٰلِكَ فَلَيۡسَ مِنَ ٱللَّهِ فِي شَيۡءٍ إِلَّآ أَن تَتَّقُواْ مِنۡهُمۡ تُقَىٰةٗۗ…  ﴾ [ال عمران: ٢٨]  
‘‘মুমিনগণ যেন মুমিন লোক ছাড়া কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব না করে। যদি কেউ এমন কাজ করে তবে আল্লাহর সাথে তার আর কোন সম্পর্ক থাকবে না। তবে ব্যতিক্রম হলো যদি তোমরা তাদের যুল্ম হতে আত্মরক্ষার জন্য সতর্কতা অবলম্বন কর। (আলে ইমরান : ২৮)
[২২] অমুসলিমদেরকে অমুসলিম না বলা। কেননা আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে তাদেরকে কাফির বলে আখ্যা দিয়েছেন। অতঃপর বলেছেন :
﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مِنۡ أَهۡلِ ٱلۡكِتَٰبِ وَٱلۡمُشۡرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَٰلِدِينَ فِيهَآۚ أُوْلَٰٓئِكَ هُمۡ شَرُّ ٱلۡبَرِيَّةِ ٦ ﴾ [البينة: ٦]  
‘‘নিশ্চয় কিতাবীদের মধ্যে যারা কুফুরী করেছে, আর যারা মুশরিক তারা জাহান্নামের আগুনে চিরস্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই হল সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্টতম।’’ (আর বাইয়্যেনা : ৬)
[২৩] এ আকীদা পোষণ করা যে, সবকিছুর মধ্যেই আল্লাহ রয়েছে। এমনকি কুকুর শুকরের মধ্যেও। গীর্জার পাদ্রীর মধ্যেও আল্লাহ রয়েছেন। আল্লাহই পাদ্রী। আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান এ আকীদাকে অহদাতুল উজূদ বলা হয়। এটা শির্কী চিন্তাধারা। এতে ঈমান ভঙ্গ হয়ে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হয়ে যায়।
[২৪] দীনকে রাষ্ট্রীয় বিষয় হতে পৃথক করা। আর একথা বলা যে, ইসলামে রাজনীতি নেই। এরূপ ধারণা ও মন্তব্যও রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনাদর্শকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।
[২৫] কিছু কিছু বিভ্রান্ত সুফীরা বলে যে, আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়া পরিচালনার চাবি কুতব নামধারী কয়েকজন আওলিয়ার হাতে অর্পণ করেছেন। তাদের এ ধারণা আল্লাহর কার্যাবলীর সাথে শিরক বলে পরিগণিত হয়। এ আকীদা আল্লাহর বাণীর বিপক্ষে চলে যায়।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ لَّهُۥ مَقَالِيدُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۗ ﴾ [الزمر: ٦٣]  
‘‘আসমান ও যমীনের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার চাবি শুধুমাত্র আল্লাহরই হাতে। (যুমার : ৬৩)
উপরে বর্ণিত বিষয়গুলো অযূ ভঙ্গের কারণসমূহের মতই ঈমান ভঙ্গকারী বিপজ্জনক উপাদান। এর কোন একটি আকীদা বা আমল কেউ যদি করে তাহলে সে লোকটি মুসলিম থেকে বহিষ্কার হয়ে যায়। ফলে তার সালাত, সাওম ইবাদত কবূলতো হবেই না। বরং অমুসলমান হয়ে আখিরাতে কাফিরদের সাথে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হয়ে যাবে। (নাউযুবিল্লাহ)
প্রশ্ন ৯ : জেনে না জেনে বা ভুলে উপরে বর্ণিত কোন এক বা একাধিক পাপ যদি কেউ করে ফেলে তাহলে এ থেকে শুধরানোর উপায় কি?
উ: তাকে আবার নতুন করে ইসলাম গ্রহণ করতে হবে। তাওবা করতে হবে খালেছ দিলে, অনুশোচনা করা ও অনুতপ্ত হতে হবে। ভবিষ্যতে এমন পাপের ধারে কাছেও আর যাবেনা, এরূপ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে হবে। তার এ তাওবা হতে হবে মৃত্যুর পূর্বে। এতে ইনশাআল্লাহ তা‘আলা তাওবা কবুল হবে এবং আল্লাহ তাকে মাফ করে দেবেন। আল্লাহর নামতো তওয়াব এবং তিনি গাফুরুর রাহীম।
৪র্থ অধ্যায় :
فوائد الصيام
সিয়ামের শিক্ষা ও উপকারিতা
প্রশ্ন ১০ : সিয়ামের মধ্যে মানুষের জীবনে কী কী উপকার রয়েছে?
উত্তর : এর উপকারিতা বহুবিধ যার অংশবিশেষ নিম্নে তুলে ধরা হলঃ
(ক) প্রথমতঃ মানসিক উপকারিতা
[১] সিয়াম তাকওয়া অর্জন ও আল্লাহ ভীরু হতে সহায়তা করে। 
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٨٣ ﴾ [البقرة: ١٨٣]  
[১] ঈমানদারগণ!, তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মাতের উপর। যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। (বাকারাহ : ১৮৩)
[২] শয়তানী শক্তি ও কু-প্রবৃত্তির ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। মানবদেহের শরীরের যে শিরা উপশিরা দিয়ে শয়তান চলাচল করে সিয়ামের ফলে সেগুলো নিস্তেজ ও কর্মহীন হয়ে পড়ে।
[৩] সিয়াম হল আল্লাহর নিকট পূর্ণ আত্মসমর্পন ও ইবাদতের প্রশিক্ষণ।
[৪] আল্লাহর আনুগত্যে ধৈর্য ধারণ ও হারাম বস্ত্ত থেকে দূরে থাকার সহনশীলতার প্রশিক্ষণ দেয় এ সিয়াম।
[৫] ঈমান দৃঢ়করণ এবং বান্দার প্রতি আল্লাহর সার্বক্ষণিক নজরদারীর অনুভূতি সৃষ্টি করে দেয়। এজন্য রোযাদার লোকচক্ষুর আড়ালে গোপনেও কোন কিছু খায় না।
[৬] দুনিয়ার ভোগ বিলাসের মোহ কমিয়ে সিয়াম পালনকারীকে আখিরাতমূখী হওয়ার দীক্ষা দেয় এবং ইবাদতের প্রতি তার ক্ষেত্র প্রসারিত করে দেয়।
[৭] সিয়াম সাধনার ফলে বান্দা সৎ গুণাবলী ও সচ্চরিত্রের অধিকারী হয়ে থাকে।
[৮] সিয়ামে ক্ষুধার অনুভূতিতে অভাবী ও দরীদ্র জনগোষ্ঠীর দূরাবস্থা অনুধাবন করতে শিখায়। ফলে তাকে বঞ্চিত ও অনাহারী মানুষের প্রতি দয়াদ্র ও সহানুভুতিশীল করে তুলে।
[৯] সৃষ্ট জীবের সেবা করার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।
[১০] সিয়াম পালন আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সাহায্য করে।
[১১] এ রমযান বান্দাকে নিয়ম-শৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতা শিক্ষা দেয়।
(খ) দ্বিতীয়তঃ দৈহিক উপকারিতা : 
[১] সিয়াম মানব দেহে নতুন সূক্ষ্ম কোষ (ঈবষষ) গঠন করে থাকে।
[২] সিয়াম পাকস্থলী ও পরিপাকতন্ত্রকে বিশ্রাম দিয়ে থাকে। ফলে এগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায় এবং তা আবার সতেজ ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠে।
[৩]মোটা মানুষের স্থূলতা কমিয়ে আনতে সিয়াম সাহায্য করে।
[৪] মাত্রাতিরিক্ত ওজন কমিয়ে এনে অনেক রোগবালাই থেকে হিফাযত করে।
[৫] অনেক অভিজ্ঞ ডাক্তারের মতে ডাইবেটিস ও গ্যাস্ট্রিক রোগ নিরাময়ে সিয়াম ফলদায়ক ও এক প্রকার সহজ চিকিৎসা।
 
৫ম অধ্যায়
عقوبة تارك الصيام
সিয়াম ত্যাগকারীর শাস্তি
প্রশ্ন ১১ : যারা বিনা উযরে সিয়াম ভঙ্গ করে তাদের শাস্তি কী হবে?
উ: তারা ভীষণ শাস্তির সম্মুখীন হবে। এ বিষয়ে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কয়েকটি হাদীস নিম্নে উল্লেখ করা হল :
[১] আবু উমামা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, একদিন আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, একটি সম্প্রদায় উল্টোভাবে ঝুলছে। তাদের গালটি ফাড়া। তা থেকে রক্ত ঝরছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম এরা কারা? বলা হল, এরা ঐসব ব্যক্তি যারা বিনা উযরে রমযান মাসের সিয়াম ভঙ্গ করেছিল। (সহীহ ইবনে খুযাইমাহ)
[২] যে ব্যক্তি (রমাযানের) এ মুবারক মাসেও আল্লাহকে রাজী করাতে পারল না, সে বড়ই দুর্ভাগা। (ইবনে হিববান)
[৩] যে ব্যক্তি শরীয়তী উযর ছাড়া এ (রমযান) মাসে একটি রোযাও ছেড়ে দেবে, সে যদি এর বদলে সারা জীবনও সিয়াম পালন করে তবু তার পাপের খেসারত হবে না। (বুখারী)
৬ষ্ঠ অধ্যায়
رؤية الهلال
চাঁদ দেখা
প্রশ্ন ১২ : কিসের ভিত্তিতে সিয়াম পালন শুরু করতে হয়? 
উত্তর : চাঁদ দেখার ভিত্তিতে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
صُومُوا لِرُؤْيَتِهِ وَأَفْطِرُوا لِرُؤْيَتِهِ
[১] তোমরা চাঁদ দেখে রোযা রাখ এবং চাঁদ দেখেই তা ভঙ্গ কর (অর্থাৎ ঈদ কর)। (বুখারী : ১৯০৯; নাসাঈ : ২১১৬)
تَرَاءَى النَّاسُ الْهِلاَلَ فَأَخْبَرْتُ رَسُولَ اللهِ -صلى الله عليه وسلم- أَنِّي رَأَيْتُهُ فَصَامَهُ وَأَمَرَ النَّاسَ بِصِيَامِهِ
[২] ইবনে ‘উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, মানুষ দলে দলে চাঁদ দেখতে শুরু করল। এমনি সময় আমি চাঁদ দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানালাম। আমার এ সংবাদের উপর ভিত্তি করে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযা রাখলেন এবং সবাইকে রোযা রাখার নির্দেশ দিলেন। (আবূ দাঊদ :  ২৩৪)
جَاءَ أَعْرَابِيٌّ إِلَى النَّبِيِّ -صلى الله عليه وسلم- فَقَالَ إِنِّي رَأَيْتُ الْهِلاَلَ يَعْنِي رَمَضَانَ فَقَالَ أَتَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلٰهَ إِلاَّ اللهُ قَالَ : نَعَمْ، قَالَ : أَتَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ قَالَ: نَعَمْ، قَالَ : يَا بِلاَلُ أَذِّنْ فِي النَّاسِ فَلْيَصُومُوا غَدًا
[৩] এক গ্রাম্য ব্যক্তি এসে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানালেন, আমি তো চাঁদ দেখেছি অর্থাৎ রমাযানের চাঁদ। অতঃপর রাসূল বললেন, তুমি কি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-(কালিমার) উপর ঈমান এনেছ? লোকটি উত্তর দিল : হ্যাঁ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার জিজ্ঞেস করলেন : তুমি কি আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ (অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল) এ কথার উপর ঈমান এনেছ? লোকটি উত্তর দিল : হ্যাঁ। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবী বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু কে বললেন, হে বেলাল! মানুষকে জানিয়ে দাও, তারা যেন আগামীকাল থেকে রোযা রাখে। (আবূ দাঊদ : ২৩৪০ হাদীসটি দুর্বল)
প্রশ্ন ১৩ : কমপক্ষে কতজন লোকে চাঁদ দেখলে এ সাক্ষী গ্রহণযোগ্য হবে?
উত্তর : কমপক্ষে একজন লোকে দেখলেও হবে। উপরে বর্ণিত হাদীসগুলো এর দলীল।
প্রশ্ন ১৪ : চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে সাক্ষীর কি ধরণের গুণাবলী থাকা দরকার?
উত্তর : একজন সাধারণ মানুষের সাক্ষ্যও গ্রহণ করা যাবে যদি তার সততা প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। যদি তার আকল বুদ্ধিতে কোন দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন না করে এবং এর মধ্যে যদি কোন ব্যক্তির স্বার্থ না থাকে।
প্রশ্ন ১৫ : আকাশ মেঘলা হলে বা অন্য কোন কারণে চাঁদ দেখা না গেলে কি করব?
উত্তর : এমন হলে ৩০ দিন পুরা করবে এবং এরপরের দিন থেকে সিয়াম পালন শুরু করবে। হাদীসে আছে-
الشَّهْرُ تِسْعٌ وَعِشْرُونَ لَيْلَةً فَلاَ تَصُومُوا حَتَّى تَرَوْهُ فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا الْعِدَّةَ ثَلاَثِينَ
মাস হল ২৯ রাত্রি। তবে চাঁদ না দেখে তোমরা রোযা রেখ না। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে ফলে চাঁদ দেখা না যায়, তবে ত্রিশ দিন পূর্ণ কর। (বুখারী : ১৮০৮)
প্রশ্ন ১৬ : পঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডারের হিসাব অনুযায়ী রোযা রাখা যাবে কি?
উত্তর : না, চাঁদ না দেখে শুধুমাত্র পঞ্জিকার লেখা বা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী রোযা বা ঈদ করা যাবে না।
প্রশ্ন ১৭ : বিভিন্ন কারণে চাঁদ দেখতে না পারলেও রমযান হয়তো শুরু হয়ে গেছে এমন সন্দেহ করে রোযা রাখা শুরু করা যাবে কি?
উত্তর : সন্দেহের দিন থেকে রোযা রাখা শুরু করা- এটা কোন বুজুর্গী কাজ নয় বরং এটা গুনাহের কাজ। সন্দেহের দিন রোযা রাখতে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পূর্ণ নিষেধ করেছেন। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করা বৈধ নয়। হাদীসে আছে,
مَنْ صَامَ الْيَوْمَ الَّذِي يَشُكُّ فِيهِ النَّاسُ فَقَدْ عَصَى أَبَا الْقَاسِمِ -صلى الله عليه وسلم-
যে ব্যক্তি সন্দেহ সংশয়পূর্ণ দিনে রোযা রাখবে সে নিশ্চিতই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অমান্য করল। (তিরমিযী : ৬৮৬)
প্রশ্ন ১৮ : অধিক পরহেযগারী কাজ মনে করে যদি কেউ দু’ একদিন আগে থেকেই রোযা পালন শুরু করে তাহলে কি সওয়াব হবে?
উত্তর : না, হবে না। বরং এটা গুনাহের কাজ। হাদীসে আছে,
لاَ تَصُومُوا قَبْلَ رَمَضَانَ صُومُوا لِلرُّؤْيَةِ وَأَفْطِرُوا لِلرُّؤْيَةِ فَإِنْ حَالَتْ دُونَهُ غَيَابَةٌ فَأَكْمِلُوا ثَلَاثِينَ
‘‘তোমরা রমযান শুরু হওয়ার আগেই রোযা রাখা শুরু করো না। চাঁদ দেখে রোযা শুরু কর এবং পরবর্তী চাঁদ দেখেই রোযা রাখা বন্ধ কর। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তবে আরো একদিন অপেক্ষা করে (শাবান মাস) ত্রিশ দিন পূরণ কর।’’ (নাসাঈ : ২১৩০)
প্রশ্ন ১৯ : যে ব্যক্তি শাবান মাসে আগে থেকেই নফল রোযা রাখার অভ্যস্ত সে কি রমযান শুরু হওয়ায় আগের দু’ একদিন নফল রোযা রাখতে পারবে?
উত্তর : হ্যাঁ, ঐ ব্যক্তি পারবে। এ ধরণের লোকের জন্য তা বৈধ। হাদীসে আছে,
لاَ تَقَدَّمُوا رَمَضَانَ بِصَوْمِ يَوْمٍ وَلاَ يَوْمَيْنِ إِلاَّ رَجُلٌ كَانَ يَصُومُ صَوْمًا فَلْيَصُمْهُ
চাঁদ না দেখেই রোযা রাখা শুরু করে তোমরা রমযানকে এক বা দু’দিন এগিয়ে নিয়ে এসো না। (অর্থাৎ এক বা দু’দিন আগে থেকেই রোযা রাখা শুরু করে দিও না)।
তবে যে ব্যক্তি আগে থেকে নফল রোযা রাখতে অভ্যস্ত তার বিষয়টি ভিন্ন। (মুসলিম : ১০৮২)
প্রশ্ন ২০ : চাঁদ দেখার বিষয়টি নিশ্চিত হতে না পারায় কেউ যদি এমনভাবে নিয়ত করে যে, যদি চাঁদ উঠে থাকে তাহলে এটা আমার ফরজ রোযা আর যদি না উঠে থাকে তাহলে হবে নফল রোযা এরূপ দোদুল্যমান নিয়ত করা কি জায়েয হবে?
উত্তর : না, এরূপ নিয়ত করা জায়েয নয়। এমন সন্দেহজনক কোন রোযা শুদ্ধ হবে না।
প্রশ্ন ২১ : কেউ যদি দূরবীন দিয়ে চাঁদ দেখে তবে কি তা জায়েয?
উত্তর : হ্যাঁ, দেখতে পারে। এতে নিষেধের কিছু নেই। তবে দূরবীন ব্যবহার করা জরুরী নয়। মানুষের স্বাভাবিক দৃষ্টির উপর নির্ভর করাই যথেষ্ট।
প্রশ্ন ২২ : কখনো কখনো অনিশ্চিত ও উড়ো খবর পাওয়া যায় যে, চাঁদ দেখা গেছে সে ক্ষেত্রে কি করব?
উত্তর : যারা চাঁদ দেখবে তাদের প্রধান দায়িত্ব হল সরকারী কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো। অতঃপর সরকার বিষয়টি যাচাই করে যে সিদ্ধান্ত দেবে সে অনুযায়ীই জনগণ রোযা রাখবে। এক্ষেত্রে একক কোন ব্যক্তি বা কিছু লোক কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। সিদ্ধান্ত নেবে শুধু সরকার। অন্যেরা শুধু সরকারকে সহায়তা করতে পারে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
الصَّوْمُ يَوْمَ تَصُومُونَ وَالْفِطْرُ يَوْمَ تُفْطِرُونَ وَالأَضْحٰى يَوْمَ تُضَحُّونَ
‘যেদিন সকলে রোযা রাখবে তোমরাও সেদিন রোযা রাখবে ; যেদিন সকলে ঈদ করবে তোমরাও সেদিন ঈদ করবে। যেদিন সকলে ঈদুল আযহা উদযাপন করবে তোমরাও সেদিনই তা করবে। (অর্থাৎ জনগণ বা জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোন কিছু করো না)’। (তিরমিযী : ৬৯৭)
প্রশ্ন ২৩ : যদি এমন হয় যে, আমি চাঁদ দেখলাম। কিন্তু আমার সাক্ষ্য সরকার গ্রহণ করল না। এমতাবস্থায় কী করব?
উত্তর : এ অবস্থায় চুপচাপ থাকাই উত্তম। যাচাই বাছাই পূর্বক সরকার যে সিদ্ধান্ত দেবে সেটাই মেনে নেবেন। জামাতচ্যুত হওয়া বৈধ নয়। সকলের সাথে থাকাই এক্ষেত্রে ওয়াজিব। (ফতওয়া ইবনে তাইমিয়া খণ্ড ২৫, পৃঃ ২১৪-২১৮)
এ বিষয়ে উলামায়ে কিরামের ২য় আরেকটি মত হল, যে ব্যক্তি স্বচক্ষে চাঁদ দেখবে সে একাকী হলেও রোযা রাখবে। আর রাখতে না পারেল তা পরে কাযা করে নিবে। (কুদুরী)
৭ম অধ্যায়
على من يجب الصيام
সিয়াম কাদের উপর ফরয
প্রশ্ন ২৪ : কাদের উপর সিয়াম পালন ফরয?
উত্তর : (১) প্রাপ্ত বয়স্ক, (২) সুস্থ বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন, (৩) মুকীম ও সমর্থবান এমন সব গুণ সম্পন্ন প্রত্যেক মুসিলম নর-নারীর উপর সিয়াম পালন করা ফরয।
প্রশ্ন ২৫ : কী অবস্থায় কাদের উপর সিয়াম ফরয নয়?
উ: নিম্নবর্ণিত দশপ্রকার মানুষের উপর সিয়াম পালন ফরয নয়, তারা হল :
[১] অমুসলিম
[২] অপ্রাপ্ত বয়স্ক/ অর্থাৎ নাবালেগ
[৩] পাগল
[৪] এমন বৃদ্ধলোক যে ভাল-মন্দ পার্থক্য করতে পারে না
[৫] এমন বৃদ্ধ ব্যক্তি যে রোযা রাখতে সমর্থ নয়। বা এমন রোগী যার রোগমুক্তির সম্ভাবনা নেই। এমন ব্যক্তিদের উপর ফিদইয়া দেয়া ওয়াজিব।
[৬] মুসাফির
[৭] রোগাক্রান্ত ব্যক্তি
[৮] ঋতুবতী মহিলা
[৯] গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারী
[১০] দুর্ঘটনায় পতিত বা বিপদগ্রস্ত লোককে রক্ষাকারী ব্যক্তি।
৮ম অধ্যায়
সিয়াম অবস্থায় যা অবশ্য করণীয়
প্রশ্ন ২৬ : সিয়াম পালনের ক্ষেত্রে কী কী কাজ ও আমল অত্যাবশ্যক?
উত্তর : সিয়াম অবস্থায় অত্যাবশ্যকীয় আমলসমূহ :
[১] পাঁচ ওয়াক্ত ফরয সালাত আদায় করা। কোন শরয়ী উযর না থাকলে সালাত মাসজিদে গিয়ে জামাআতের সাথে আদায় করা। জামাআতে সালাত আদায়কে বিজ্ঞ ওলামায়ে কিরাম ওয়াজিব বলেছেন। যারা জামাআতের সাথে সালাত আদায় করে না তারা ২৭ গুণ সাওয়াব থেকে বঞ্চিততো হয়ই, উপরন্তু ফজর ও ঈশার জামাআত পরিত্যাগকারীকে হাদীসে মুনাফিকের সাথে তুলনা করা হয়েছে। যারা অবহেলা করে বিনা ওযরে সালাত দেরী করে আদায় করে তার সালাত একশবার পড়লেও তা কবুল হবে না বলে উলামায়ে কিরাম মন্তব্য করেছেন। আর মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় থেকে বিরত থাকতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্ধ ব্যক্তিকেও অনুমতি প্রদান করেন নি। 
[২] মিথ্যা না বলা।
[৩] গীবত না করা- আর তা হলো অসাক্ষাতে কারো দোষত্রুটি বা সমালোচনা করা
[৪] চোগলখোরী না করা- আর তা হলো এক জনের বিরুদ্ধে আরেকজনকে কিছু বলে ক্ষেপিয়ে তোলা ও ঝগড়া লাগিয়ে দেয়া।
[৪] ক্রয় বিক্রয় ও অন্যান্য কাজে কাউকে ধোঁকা না দেয়া।
[৫] গান গাওয়া ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো থেকে বিরত থাকা, মধুর কণ্ঠে গাওয়া যৌন উত্তেজনামূলক গান থেকে আরো বেশি সাবধান থাকা।
[৬] সকল প্রকার হারাম কাজ-কর্ম পরিহার করা।
জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন,
إِذَا صُمْتَ فَلْيَصُمْ سَمْعُكَ وَبَصَرُكَ وَلِسَانُكَ عِنْدَ الْكَذِبِ وَالْمَحَارِمِ وَدَعْ عَنْكَ أَذَى الْجَارِ وَلْيَكُنْ عَلَيْكَ وَقَار وَسَكِيْنَة وَلاَ يَكُنْ يَوْمُ صَوْمِكَ وَيَوْمُ فِطْرِكَ سَوَاء
যখন তুমি রোযা রাখবে তখন যেন তোমার কর্ণ, চক্ষু এবং জিহবাও মিথ্যা ও হারাম কাজ থেকে রোযা রাখে। তুমি প্রতিবেশিকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকো। আত্মমর্যাদা ও প্রশান্তভাব যেন তোমার উপর বজায় থাকে এমন হলে তোমার রোযা রাখা ও না রাখা সমান হবে না। (ইবন আবী শাইবা : ৮৮৮০)
[৭] ইসলামকে জীবনের সকলক্ষেত্রে অনুসরণ করা।
মসজিদে যেমনভাবে ইসলাম তেমনি পরিবার, সমাজ, ব্যবসা এবং রাষ্ট্রীয় জীবনেও ইসলামকে একমাত্র জীবন বিধান হিসেবে বাস্তবায়ন করা। 
আল্লাহ বলেন,
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱدۡخُلُواْ فِي ٱلسِّلۡمِ كَآفَّةٗ ﴾ [البقرة: ٢٠٨]  
‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইসলামে দাখিল হও পরিপূর্ণভাবে (অর্থাৎ জীবনের সর্বক্ষেত্রে)। (বাকারাহ ২০৮)
[৮] সিয়াম আবস্থায় পাপাচার ত্যাগ করা এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকা।
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : 
كَمْ مِنْ صَائِمِ لَيْسَ لَهُ مِنْ صِيَامِهِ إِلاَّ الظَّمْأَ وَكَمْ مِنْ قَائِمِ لَيْسَ لَهُ مِنْ قِيَامِهِ إِلاَّ السَّهْر 
(ক) কত সিয়াম পালনকারী আছে যাদের রোযা হবে শুধু উপোস থাকা। আর কতলোক রাতের ইবাদতকারী আছে যাদের রাত জাগরণ ছাড়া ইবাদতের কিছুই হবে না। (অর্থাৎ পাপকাজ থেকে বিরত না হওয়ার কারণে তার রোযা যেন রোযা নয়, তার রাতের সালাতও যেন ইবাদত নয়)। (আহমাদ : ৯৬৮৩; দারেমী : ২৭৬২)
فَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلاَ يَرْفُثْ يَوْمَئِذٍ وَلاَ يَصْخَبْ فَإِنْ سَابَّهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ فَلْيَقُلْ إِنِّي امْرُؤٌ صَائِمٌ
(খ) তোমাদের মধ্যে কেউ যদি রোযা রাখে, সে যেন তখন অশ্লীল কাজ ও শোরগোল থেকে বিরত থাকে। রোযা রাখা অবস্থায় কেউ যদি তাকে গালাগালি ও তার সাথে মারামারি করতে আসে, সে যেন বলে ‘‘আমি রোযাদার’’। (মুসলিম : ১১৫১)
لَيْسَ الصِّيَامُ مِنَ الأَكْلِ وَالشُّرْبِ إِنَّمَا الصِّيَامُ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ
(গ) শুধুমাত্র পানাহার ত্যাগের নাম রোযা নয়, প্রকৃত রোযা হল (সিয়াম অবস্থায়) বেহুদা ও অশ্লীল কথা এবং কাজ থেকে বিরত থাকা। (ইবনু খুযাইমা : ১৯৯৬)
مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ وَالْجَهْلَ فَلَيْسَ للهِ حَاجَةٌ أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ
(ঘ) যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ এবং অজ্ঞতা থেকে মুক্ত হতে পারেনি সে ব্যক্তির শুধুমাত্র পানাহার বর্জনের (এ সিয়ামে) আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। (বুখারী : ৬০৫৭)
[৯] রোযা রাখা (ও অন্যান্য ইবাদত) একমাত্র আল্লাহকে খুশী করার জন্য করা। আল্লাহ বলেন,
﴿ وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ … ﴾ [البينة: ٥]  
‘‘মানুষকে এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তাদের ইবাদত যেন শুধুমাত্র আল্লাহকে খুশী করার জন্য হয়।’’ (বাইয়্যেনাহ : ৫)
[১০] সকল হুকুম আহকাম পালনে নাবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র সুন্নাত তরীকা অনুসরণ করা।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ عَمِلَ عَمَلاً لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ
‘‘যে ব্যক্তি এমন (তরীকায়) কোন আমল করল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নির্দেশিত সেই কাজ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য তো হবেই না রবং) তা হবে প্রত্যাখ্যাত’। (মুসলিম : ১৭১৮)
[১১] সিয়াম ভঙ্গের সহায়ক কাজ-কর্ম পরিহার করা স্বামী-স্ত্রীর আলিঙ্গন, চুম্বন বা একত্রে শয়ন জায়েয হলেও তা যেন রোযা ভঙ্গের পর্যায়ে নিয়ে না যায় সে বিষয়ে সতর্ক থাকা।
[১২] অন্তরে ভয় ও আশা পোষণ করা।
কোন অজানা ভুলের জন্য রোযাটি ভেঙ্গে যায় কিনা এ ধরনের ভয় থাকা এবং আল্লাহর কাছে এর প্রতিদান পাবো এ আশাও পোষণ করা। অন্তরকে এ দু’য়ের মধ্যে সামঞ্জস্য করে রাখতে হবে।

 

Check Also

আল্লাহ কেন সকল মানুষকে মুসলিম হতে বাধ্য করেন নি?

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি …

মন্তব্য করুন

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *