Home / প্রশ্নোত্তর / ইজমা কি এবং শরীয়তে তার গুরুত্ত

ইজমা কি এবং শরীয়তে তার গুরুত্ত

প্রবন্ধটি পড়া হলে শেয়ার করতে ভুলবেন না।

শুরু করছি মহান আল্লাহর নামে যিনি পরম করুনাময়, অসীম দয়ালু।

লেখকঃ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাজ্জাক

ইজমার শাব্দিক অর্থঃ ইজমা শব্দটি মুশতারাক তথা একই শব্দ কিন্তু বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অর্থ দিয়ে থাকে। ইজমা শব্দটি মুলত দুইটি অর্থ দিয়ে থাকে

১, একমত হওয়া
যেমন আল্লাহ পবিত্র কুরানে বলেন
فلما ذهبوا به وأجمعوا أن يجعلوه في غيابات الجب

“তথা যখন তারা ইউসুফকে নিয়ে গেল এবং এই বিষয়ে এক মত হল যে তারা ইউসুফকে একটি কুয়াতে নিক্ষেপ করবে”। সুরা ইউসুফ ১৫

এখানে ইজমা শব্দটি একমত অর্থে ব্যবহার হয়েছে।

২, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া
যেমন মহান আল্লাহ বলেন
فَأَجْمِعُواْ أَمْرَكُمْ
তথা তোমরা তোমাদের সিদ্ধান্তকে চুড়ান্ত কর। (সুরাঃ ইউনুস ৭১)
পারিভাষিক অর্থঃ
ইজমার পারিভাষিক অর্থ নিয়ে উলামাদের মধ্যে অনেক ইখতিলাফ আছে। ইমাম শাফেয়ী রহঃ তার রিসালা গ্রন্থে ইজমার যে সংঞা করেছেন তাতে তিনি আম জনসাধারন এবং মুজতাহিদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেন নি বরং ইজমা করার অধিকার সবাইকে দিয়েছেন। তবে সকলেই মনে করেন তার এই সংঞা মুলত ইসলামের অকাট্য জরুরী বিষয় নিয়ে যেমনঃ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত,রমজানের সিয়াম।

ইমাম মালেকের দিকে নিসবাত করে বিভিন্ন বইয়ে লেখা আছে যে, তার নিকট শুধু আহলে মদীনার একমত পোষণ করা ইজমা।
অনুরুপ ইবনে হাজাম আন্দালুসী রহঃ তার আল ইহকাম ফি উসুলিল আহকাম বইয়ে ইজমা বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি ইজমাকে শুধু সাহাবীদের ইজমার মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছেন।

এছাড়া জমহুর ওলামায়ে কেরামের নিকট ইজমা শুধু মুজতাহিদদের একমত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয় যেমন শায়খ সলেহ আল উসাইমীন রহঃ বলেন
রাসুল ছাঃ এর মৃত্যুর পর উম্মাতে মুস্লিমার মুজতাহিদ গণ কোনো বিষয়ে একমত পোষোণ করা।
তবে তিনি এই সংঞাতে সময়কে শর্তযুক্ত করেননি কিন্তু শায়খ আব্দুল মুহাসিন আব্বাদ তার তাসহিলুল উসুলে এবং এছাড়া প্রায় সকল আলেম ওলামা সময়কে শর্ত যুক্ত করেছেন। তথা একই সময়ের সকল মুজতাহিদ কোনো বিষয়ে একমত পোষন করলে ইজমা বলা হবে।
ইজমা কি হুজ্জাতঃ

ইজমার সংঞা নিয়ে মতভেদের পাশাপাশি ইজমা কি দলীল হিসেবে গ্রহনযোগ্য এ নিয়েও বিস্তর ইখতিলাফ রয়েছে

বিপক্ষের দলীলঃ যারা ইজমাকে হুজ্জাত বলতে চান না তাদের দাবী অনুযায়ী ইজমা হওয়াই সম্ভব নয়। কেননা একই সময়ে উম্মাতে মুসলিমার সকল আলেম একত্রিত হয়ে একটা ফায়সালা নিবেন বা নিয়েছেন এর কোনও নজির ইসলামের ইতিহাসে নাই। সেই হিসেবে একই সময়ে মুজতাহিদদের কোনো বিষয়ে একমত হওয়া এক প্রকার অসম্ভব।

এছাড়া মুয়ায রাঃ এর হাদীসে রাসুল ছাঃ কুরান ও হাদীসের পর ইজতিহাদের কথা বললেও ইজমার কথা বলেন নি। এবং প্রত্যেক ঐ আয়াত এবং হাদীস যেখানে রাসুলের সুন্নাত ও আল্লাহর কুরানের অনুসরনের কথা আছে অন্য কিছু নাই সেগুলো সবই তাদের জন্য দলীল।

পক্ষের দলীলঃ যারা ইজমাকে দলীল হিসেবে পেশ করতে চান তাদের প্রধান কয়েকটি দলীল হছে

১, মহান আল্লাহ পবিত্র কুরানে বলেন
“যে কেউ সরল পথ প্রকাশিত হওয়ার পর রাসুলের বিরুদ্ধাচারন করে এবং সব মুসলমানের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে,আমি তাকে ঐ দিকেই ফেরাব যে দিক সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।আর গন্তব্য স্থল অনেক খারাপ”।  [নিসাঃ১১৫] এখানে রাসুলের বিরুদ্ধাচারনের পাশাপাশি মুসলমানদের একমতে পরিচালিত কাজেরও বিরুদ্ধাচারনের বিষয়ে বলা হয়েছে।

মহান আল্লাহ আরো বলেন
যখন তোমরা পরস্পর ইখতিলাফ করবে তখন কুরান ও হাদিসের দিকে ফিরে যাও তথা পরস্পর ইখতিলাফ না থাকলে এবং এক কথার উপর একমত হলে কোনও সমস্যা নাই। সেটাই মানা হবে ।
রাসুল ছাঃ বলেছেন আমার উম্মাতের মধ্যে এক দল লোক চিরদিন হকের উপর টিকে থাকবে। এই হাদিস প্রমান করে যে, একই সময়ে উম্মাতে মুসলিমার সকলেই ভ্রান্তির উপর থাকতে পারেনা, যদি থাকে তাহলে সেই সময়ে হকের উপর টিকে থাকা কোনও দল থাকলনা। আর রাসুলের কথা অনুযায়ী অবশই থাকবে।
বাস্তবতা বিশ্লেষণঃ বাস্তবেই সাহাবিদের কোনো বিষয়ে একমত পোষোণ করা অবশ্যই হুজ্জাত বা দলিল। এমন কি এর মুনকির কাফির হয়ে যেতে পারে। যেমন সাহাবিদের আবু বাকার রাঃ এর খিলাফাতের উপর একমত পোষণ করা।

কিন্তু এরপরে কোনো এক সময়ে উম্মাতের সকল মুজতাহিদদের একত্রিত হয়ে একমত হওয়ার নজির নাই এবং তা সম্ভবও ছিলনা।তবে মুজতাহিদদের মৃত্যুর পর তাদের মন্তব্য জমা করত জানা সম্ভব হতে পারে যে, এই সময়ের প্রায় সকল আলেম একই মত পোষণ করতেন। মুজতাহিদ দের এই রকম ঐক্যমত সাহাবীদের ইজমার মত শক্তিশালী না হলেও এর গুরুত্ব কোনো সুষ্ঠ বুদ্ধির মানুষ ইনকার করতে পারেনা। যাকে আমরা ইজমায়ে সালাফ বলতে পারি।

তবে উল্লেখ্য যে, ইজমা আগের কোনো হুকুম কে মানসুখ করতে পারেনা যেমন আল্লামা শাওকানী রহঃ তার ইরশাদুল ফুহুলে ইজমার আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন
الإجماع لا ينسخ ولا ينسخ به عند الجمهور
ইজমাকে কেউ মানসুখ করেনা এবং ইজমাও কাউকে মানসুখ করেনা। আর এটাই জমহুর ফুকাহার কওল।
সুতরাং ইজমার দোহাই দিয়ে রাসুল ছাঃ এর জামানা থেকে চলে আসা জুমার এক আজনকে মানসুখ করার কোনও সুযোগ নাই।

বরং এর উল্টাভাবে বলা যাবে যে, উসমান রাঃ এর আগ পর্যন্ত সকল সাহাবির এক আজানের উপর ইজমা ছিল। এখন নতুন কারনে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেই কারন আবার পাওয়া গেলে সেই সিদ্ধান্ত নিতে কোনো বাধা নাই।

আর ইজমা মুলত আলাদা স্বাধীন কোনো শারয়ী দলিল নয় । বরং কুরান ও হাদীসের সঠীক ব্যখ্যা ও বুঝের একটা সহায়ক অস্ত্র। পাতিলের মধ্যে রাখা ভাত আর পানিকে তুলে আনার চামচ মাত্র ।

Check Also

আল্লাহ কেন সকল মানুষকে মুসলিম হতে বাধ্য করেন নি?

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি …

মন্তব্য করুন

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *